সচিন ভাই বললেন , "দাদা দুপুরে বসে কি করবেন? চলিয়ে মেরা জমিন দেখকে আয়েঙ্গে।" পাশের থেকে খাওয়া দাওয়ার পর আধ শোয়া আধো বোজা চোখে অর্চি বলে উঠলো "চলো চলো, ল্যাদ খেয়ে কি করবে?" ঠিক হলো দুটোর সময় বেরোনো হবে। সচিন এর ভাইয়ের একটা মারুতি আল্টো গাড়ি আছে, আমি বললাম - “ঠিক আছে আমি চালিয়ে নেবোখন।“

 আধ শোয়া হয়ে জানালা দিয়ে দেখছিলাম হিমালয়ের শৈলরাজি, দূরে লাভা লোলেগাঁও, দেখা যাচ্ছে  নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। নানা রংবেরং এর পাখি, তাদের ডাক, সঙ্গে ঝিরি ঝিরি তিরি তিরি শব্দ বাতাসের আর গাছের পাতার প্রেমালাপ। সব থেকে ভালো অনুভূতি ,মোবাইল ফোন এ নেটওয়ার্ক এর সাবলীল অনুপস্থিতি।  আমাকে দেখে অর্চি আবার বললো , "কেমন লাগছে জায়গা টা ?” আমি নির্বাক, বলা ভালো হতবাক। 

আমরা কলকাতা থেকে একটা হোমস্টে বুক করেছিলাম রামদুরা তে।  কিন্তু থাকাটা  খুব একটা সুখকর হলো না।  এই প্রপার্টি গুলো রাস্তার পাশে খাদের ঢাল বরাবর হয়। তাই এক দিকের ঘর গুলো মন ভালো করা পাহাড়ী দৃশ্য জানালাতে সাজিয়ে বসে থাকে, আর অন্য দিকের ঘর গুলো হয় দৃশ্য বিমুখ - শুধু শব্দ-কল্প - দ্রুম এ ভরা। দ্রুম দ্রুম করে মোটর গাড়ি আর মোটর বাইক এর দস্যিপনা। আমাদের কপালে পড়লো সেরকম এক রাস্তা ঘেঁষা রুম। 

পরের দিন সকালেই আমরা রুম ছেড়ে দিলাম। অর্চির বুদ্ধিতে চড়ে বসলাম এক, বালি ভর্তি ট্রাকে। সে আমাদের নামিয়ে দিলো আলগড়াতে।  আর সেখানেই অর্চির পরিচিত এই সচিন ভাইয়ের হোমস্টে।  এখানে সিনেমার শুটিং এ অনেক অভিনেতা রা এসেছেন। দেওয়াল ভর্তি সব ছবি।  

দুপুর দুটো দ'শে সচিন ভাইয়ের মারুতি আল্টোতে চাপলাম এক্কেবারে ড্রাইভার সিট্ এ।  অর্চি আগেই জানতো আমার উটি তে ৩৬ হেয়ার পিন বেন্ড এ গাড়ি চালাবার অভিজ্ঞতা আছে , তাই নাকি আমাকেই হতে হবে বলির পাঁঠা।  সচিন ভাই নিজে গাড়ি চালাতে জানেন না , যাই হোক , পাঁচ জন চললাম সচিন ভাই এর জমি দেখতে। পেদং রোড থেকে তেল হাওয়া নিয়ে গাড়ি ছোটালাম সান্তুক এর রাস্তায়। অসাধারণ ঝক ঝকে রাস্তা , নৈসর্গিক দৃশ্য , এক একটা বাঁক নিচ্ছি আর মনে হচ্ছে 'তিন নম্বর স্বর্গ লেন' এই পথেই।  খানিক দূরে গিয়ে বাঁক নিলাম লোয়ার সান্তুক এর পথে। বৃষ্টি হচ্ছে 'টুপ টাপ টিপ', গাড়ি নামছে পাহাড়ের পাঁজর ঘুরে ঘুরে, গিয়ার এর ওপর চালাচ্ছি গাড়ি কারণ বেশি ব্রেক ব্যবহার করলে তা খুব তাড়াতাড়ি অকেজো হয়ে পড়বে।  

সাড়ে চার পাঁচ কিলোমিটার চলার পর এসে থামলাম এক রাস্তার প্রান্ত সীমায়। অনেক গাড়ি আর বাইক এখানে রাখা রয়েছে। আমাদের গাড়ি এখানে রেখে শুরু হলো হাঁটা। আমি , অর্চি , সচিন , সচিন ভাইয়ের আরেক গেস্ট অম্বরীশ আর সচিন ভাইয়ের ভাইপো।  পাহাড়ে উঠতে যেমন ফুসফুসের কষ্ট আবার নামতে কষ্ট হাঁটুর।  নেমে চললাম নিচে , কানে আসতে লাগলো অনেক মানুষের আনন্দের চিৎকার আর সামান্য পাহাড়ি জলরাশির বয়ে যাবার শব্দ।  মিনিট দশেক হাঁটবার পর এসে পড়লাম এক পাহাড়ি নদীর কিনারায়। এই গরমে ছোট্ট জিরজিরে নদী , কিন্তু জঙ্গলের গাছের পায়ের কাছে জলের দাগ দেখে অনুমান করা যায় যে এ নদী বর্ষায় বিশাল আকার ধারণ করে। নদীর পাশ বরাবর উত্তর দিক হেঁটে পাওয়া গেলো এক দারুন সুন্দর হোমস্টে। লোক জন এখানেই জমায়েত হয়েছে।  পাহাড়ি নদি এসে এক জায়গা তে এক ছোট্ট দহ তৈরী করেছে , সেখানে ছোট, বড়, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই জলের ভেতর - চান, সাঁতার, জলকেলি তে মত্ত। হোমস্টের কাফে থেকে যাচ্ছে গরম কফি , ঠান্ডা পানীয় , কাবাব , মোমো আরো কত কি।

চারদিকে পাইন দেবদারুর জঙ্গল, দূর থেকে বয়ে আশা আপাত ক্ষীনকটি নদী সেই হোমস্টের পাদপ্রান্তে এসে আসর জমিয়েছে।  আর কি অদ্ভুত মাটির আর পাথরের রং , যেন মনে হচ্ছে কে যেন রুপালি রং চুপিয়ে দিয়ে গিয়েছে।জানলাম এখানকার মাটিতে মাইকার আধিক্য। সেই জায়গায় কিছুক্ষন বসে, এক কাপ করে গ্রীন টি খেয়ে আমরা পাঁচজন চললাম সচিন ভাইয়ের জমি দেখতে।  এইবার পায়ে হেঁটে চললাম নদীর পাশ ধরে দক্ষিণ দিক বরাবর , কিছুটা এসে একটা ছোট্ট ম্যান মেড সাঁকো , আসলে দুটো পাহাড়ি গাছ কেটে জলের ধারার ওপর আড়াআড়ি ফেলে রাখা পারাপারের জন্য। পেরোলাম সেই সাঁকো , হাঁটতে থাকলাম জঙ্গলের ভেতর দিকে।  এই পাহাড়ি জঙ্গলে ট্রেকিং এর অভিজ্ঞতা আমার প্রথম।  এই দিকের হিমালয় তে আমার প্রথম আসা।লেহ লাদাখ গিয়েছি কিন্তু কোনোদিন দার্জিলিং আসি নি। 

ট্রেকিং এর আসল স্বাদ পেতে শুরু করলাম কিছুক্ষণ পর থেকে, বড় বড় বোল্ডার, নুড়ি পাথর, ফার্ন , ছোট ঝোপ সব ই রয়েছে এই নদী গর্ভে।  ঠিক যেন মনে হচ্ছে নদী তার কমজোরি ছানা পোনা দের ফেলে গ্যাছে কোনো কাজের অছিলায়, বর্ষা পেলেই ফিরবে দ্রুত। কখনো বড় পাথরের ওপরে উঠছি ঠেলে, কখনো লাফিয়ে পেরোচ্ছি নদীর অপুষ্ট বাঁক। ভুল বশত আমি আবার গায়ে চাপিয়েছি একটা মোটা পুলোভার টাইপের গেঞ্জি, প্রচন্ড ঘামে অসোয়াস্তি হয়েছে বারেবার। একবার বিরক্ত হয়ে খুলেই  ফেললাম, কিন্তু মনে ভয় হলো, এই বিশাল বপু যেন কেউ Yeti ভেবে ভুল না করে বসে।  

জঙ্গলের আনাচে কানাচে ছোট বড় অনেক পশু পাখির অস্তিত্ব জানান দেওয়া চিহ্ন, সঙ্গে অসংখ্য পাখির ডাক। সন্ধ্যে বেলা তাদের ঘরে ফেরার তাগিদ।  এ জঙ্গলে ভাল্লুক আর লেপার্ড থাকতেই পারে।  তাছাড়া শেয়াল, খরগোশ অনেক আছে। হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌছালাম নদীর একটা বড় বাঁকে। সেখানে দেখলাম গ্রামের বাসিন্দারা মাছ ধরবার ট্র্যাপ  বানিয়ে রেখেছেন , সচিন ভাই দেখালেন অদ্ভুত সুন্দর জিনিস টা।  অনেকটা অভিমন্যুর ভেদ করা চক্রব্যূহ এর মতন, ভেতরে ছোট ছোট অনেক মাছ ঢুকে পড়েছে, কিন্তু স্রোতের বিপরীতে তাদের বেরোবার যো নেই ।  এইবার একটা বাঁ দিক নিয়ে, নদী পথ ছেড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করলাম আমরা , এ যেন রাজা দোবরুপান্নার পরিবারের সেই রাজ সমাধি ক্ষেত্র দেখতে চলেছি।  

অর্চিষ্মান আর আমি ভিডিও করতে করতে পৌঁছে গেলাম সেই জমির ওপর।  একটা বিশাল বড় পাথরের চাটান , লায়ন কিং সিনেমাতে যেমন দেখেছি, যেখান থেকে রাজা তাঁর সন্তান কে তুলে ধরে দেখান, একদম সেইরকম সেই বিশাল মনোলিথ পাথর। তার পেছন থেকে শুরু সচিনদের তিন ভাইয়ের জমি। চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলাম এখানে একটা তাঁবু খাটিয়ে রাত্রি বাস করছি আমি , কিন্তু খুব একটা ভরসা পেলাম না।  ভাল্লুকের হাতে মৃত্যু শুনেছি নাকি খুব সাংঘাতিক, যদিও বিবাহিত পুরুষের সে ভয় করাটা পাপ।  পাশে পাহাড়ি নদী , গোটা তিরিশ ফুট ওপরে পাহাড়ের গা বেয়ে এই আমাদের সচিন ভাইয়ের জমি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, যতটা পথ এসেছি আবার ফেরত যেতে হবে ততটা। আবার শুরু হল হন্টন। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে আবার কখনো নামতে নামতে দেখলাম প্রচুর গাছ, অর্কিড , বিশাল ইয়াব্বড় এক বৃশ্চিক আর চোখে সর্ষে ফুল। সরু মোটা নানা পথ পেরিয়ে ফিরলাম আমাদের গাড়ির কাছে, ড্রাইভার সিট্ এ বসলাম আবার, বৃষ্টি শুরু হয়েছে।  পাহাড়ের বৃষ্টি কিন্তু আমার খুব মন খারাপ করে দেয়। আবার আমাদের ড্রাইভ করে উঠতে হবে পাঁচ কিলোমিটার পথ, বৃষ্টির ভেতর। 

এই স্মৃতি খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে সারা জীবন।  পরের দিন পেটের দায়ে ফিরতে হল কলকাতার পথে , আর সচিন ভাই থেকে গেলেন পেছনে - পেটের দায়ে। কি অদ্ভুত সমাপতন - এক ট্রাভেলার আর এক হোস্টের জীবনে। এনিওয়ে থামলে তো চলবে না , কে যেন বলে গ্যাছেন "চড়ুইভাতি ", পাশ থেকে অর্চি বলে উঠলো, "দাদা ওটা চরৈবেতি হবে "